সারাদেশ

এত্ত পেঁয়াজ তবু বাড়ল দাম!

হঠাৎ করে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে ভারত। এ ঘোষণার পরপরই দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে দেশে বর্তমানে ৬ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। এ পেঁয়াজ দিয়ে ৩ মাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের ট্যারিফ কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, পেঁয়াজের সংকট বা মূল্য বৃদ্ধির কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। শুধু ভারতের রপ্তানি বন্ধের ঘোষণাতেই পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ করেছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। ফলে বিপাকে সাধারণ ভোক্তা। দেশে বর্তমানে প্রতিমাসে ২ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে।

এদিকে ভারতের নিষেধাজ্ঞায় আটকে পড়া পেঁয়াজের একটি অংশ দেশটির সরকারের অনুমতির পরও বেনাপোল দিয়ে কোনো ট্রাক আসেনি। জানা গেছে, হিলি স্থলবন্দরের ওপারের সীমান্তে পেঁয়াজভর্তি দেড় শতাধিক ট্রাক রপ্তানির অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারসাজি করেই পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে। দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একশ্রেণির ব্যবসায়ী পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মজুদ করছেন। বর্তমানে তারা পেঁয়াজ বিক্রি করছেন না। দাম বাড়িয়ে বিক্রি করার ছক কষেছেন।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আজহার আলী আমাদের সময়কে বলেন, পাবনায় বর্তমানে ৭৫-৮০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। ফরিদপুরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্তর সূত্র জানায়, ফরিদপুরে ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। রাজবাড়ী জেলায় মজুদের পরিমাণ ২৫ হাজার মেট্রিক টন।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক গোপাল কৃষ্ণ দাস আমাদের সময়কে বলেন, রাজবাড়ী থেকে প্রতিনিয়ত পেঁয়াজ ঢাকাসহ সারাদেশে যাচ্ছে। এ বছর জেলায় রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। নওগাঁ জেলায় ৪০ হাজার, রাজশাহী জেলায় ৫৭ হাজার, নাটোরে ৬৭ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। নলডাঙ্গা উপজেলায় ৪৮ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া বড় ধরনের মজুদ আছে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার শ্যামবাজারে। আগস্টে ৭২ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৪ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।

অন্যদিকে পেঁয়াজ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও মানিকগঞ্জে বর্তমানে পেঁয়াজের মজুদের পরিমাণ ৫ লাখ ২৫ হাজার টন। বাংলাদেশে পেঁয়াজের মৌসুম আসতে এখনো ছয় মাস বাকি। এ সময়ে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় তিন মাসের পেঁয়াজ মজুদ আছে। বাকি তিন মাসের পেঁয়াজ আমদানি করে মেটাতে হবে। অর্থাৎ মার্চের আগ পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। সাধারণত স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে পেঁয়াজের চাহিদা পূরণ করা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্থানীয়ভাবে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৫৭ হাজার টন। এর মধ্যে ২২-২৫ শতাংশ সংগ্রহকালীন এবং সংরক্ষণকালীন ক্ষতি বাদ দিলে স্থানীয় উৎপাদিত পেঁয়াজ থেকে বাজারে সরবরাহ করা হয় ১৯ লাখ ১৭ হাজার টন।

এ ছাড়া ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে ৪ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন। যা ২০১৯ সালে ছিল ৬ লাখ ৭৪ হাজার এবং ২০১৮ সালে ৬ লাখ ৯৬ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ ২০১৯ ও ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে যথাক্রমে ৩৫ ও ৩৮ শতাংশ পেঁয়াজ কম আমদানি হয়েছে। আমদানি কম হওয়ায় চলতি বছর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পেঁয়াজের ব্যবহার বেশি হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, করোনা সংক্রমণের শুরুর পর এপ্রিলের দিকে বাংলাদেশে সব ধরনের আমদানি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। স্বাভাবিক আমদানি না থাকায় দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ ব্যবহার হয়েছে বেশি।

হঠাৎ করে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ করে দেয়। ফলে বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পেঁয়াজের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে ভারতের বিকল্প হিসেবে আট দেশ (মিয়ানমার, আফগানিস্তান, মিসর, তুরস্ক, চীন, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও নেদারল্যান্ডস) থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, হঠাৎ ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন। তবে বাজার যেন না বাড়ে সে জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভারতের বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ছাড়া যারা পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০ টাকা কেজি দরে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি কার্যক্রম চালু রয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দিন বলেন, দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ মজুদ আছে, তাতে এ মুহূর্তে বাজারে কোনো সংকট তৈরি হবে না। আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, তাতে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক থাকবে এবং মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে সরকার সব ধরনের কৌশল নিচ্ছে। ভারতের পক্ষ থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা আসার পরপরই আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছি যেন দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ চেইনে কোনো সংকট তৈরি না হয়। আশা করি পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারলে মূল্যও যৌক্তিক পর্যায়ে থাকবে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ভারত যেন তুলে নেয় সে জন্য অনুরোধ জানানো হবে। একই সঙ্গে বিকল্প বাজার থেকে আমদানি করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, নিষেধাজ্ঞায় আটকে পড়া পেঁয়াজের একটি অংশ ভারত সরকার ছেড়ে দেওয়ার সম্মতি জানালেও শেষ পর্যন্ত কোনো ট্রাক বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করেনি। গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত পেঁয়াজের কোনো ট্রাক বেনাপোল বন্দরে ঢোকেনি।

বেনাপোল কাস্টমস কার্গো শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা আকসার উদ্দীন মোল্লা জানান, ভারত থেকে পেঁয়াজ ঢোকার কথা ছিল। আমরা দিনভর অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশ অংশে কোনো গেটপাস না আসায় গত দুদিনে কোনো পেঁয়াজ আমদানি হয়নি। ওপারে সব ট্রাক আটকে আছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ আমদানিকারক খুলনার হামিদ এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি সরোয়ার জনি জানান, ভারতে আটকে পড়া ট্রাকের কিছু ছাড়তে চেয়েও দিল না। সামনে দুদিন বন্দর বন্ধ। গরমে আটকে পড়া পেঁয়াজ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে।

বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রপ্তানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, সংকট জানিয়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ যৌক্তিক নয়।

হিলি প্রতিনিধি জানান, গত সোমবার থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রয়েছে। রপ্তানির অপেক্ষায় ওপার সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে পেঁয়াজবোঝাই দেড় শতাধিক ট্রাক। গত ৪ দিনে আটকে থাকা পেঁয়াজ ইতোমধ্যেই নষ্ট হতে চলেছে বলে জানিয়েছেন হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন উর রশিদ হারুন।

ভারত সরকার বাংলাদেশে পেঁয়াজ সরবরাহ করবে না এমন সিন্ধান্তে অনড় থাকলেও গত রবিবার টেন্ডার করা পেঁয়াজ বাংলাদেশে সরবরাহ করবে তারা। তবে বুধবার ও বৃহস্পতিবারও পেঁয়াজ রপ্তানি করেনি ভারত। আদৌও পেঁয়াজ রপ্তানি করবে কি না এ নিয়ে শঙ্কিত হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারকরা।

Comment here