সমগ্র বাংলাসিলেট

জঙ্গিদের টার্গেট ছিল শাহজালাল মাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঈদুল আজহার আগে সিলেটের হযরত শাহজালালের (র) মাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার ছক করে জেএমবির (জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ) নব্যধারা (নব্য জেএমবি)। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তারা এই ছক কষে। এর অংশ হিসেবেই জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে রাজধানীর পল্টনে পুলিশ চেকপোস্টের পাশে এবং নওগাঁর সাপাহারে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে বোমা হামলা করে। পুলিশের নজরদারির কারণে শাহজালালের মাজারে হামলা করতে ব্যর্থ হয়। শাহজালালের মাজারে হামলা করতে জঙ্গিদের একটি সেল শাপলাবাগে বাসা ভাড়াও নিয়েছিল।

পল্টনের বোমা বিস্ফোরণ ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে গত মঙ্গলবার সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তাদের গ্রেপ্তারের পর গতকাল বুধবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম। তিনি জানান, সিটিটিসির এই গ্রেপ্তার অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এলিগ্যান্ট বাইট’। গ্রেপ্তার পাঁচজন হলেন- শেখ সুলতান মোহাম্মদ নাইমুজ্জামান, সানাউল ইসলাম সাদি, রুবেল আহমেদ, আব্দুর রহিম জুয়েল ও সায়েম মির্জা। এ সময় তাদের কাছ থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জাম, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

মনিরুল ইসলাম জানান, শাহজালালের মাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার জন্য নব্য জেএমবির যে সেলটি গঠন করা হয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিলেন শেখ সুলতান মোহাম্মদ নাইমুজ্জামান। নাইমুজ্জামান কফিশপে (বারিস্তা) কফি মেকার হিসেবে কাজ করেন। তিনি ২০১৯ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। সানাউল ইসলাম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র। রুবেল আহমেদ ২০১৬ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ব্লু বার্ড সিলেট শাখা থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেন। তিনি সিলেটে টুকেরবাজারে সার, বীজ ও কিটনাশকের ব্যবসা করেন। আব্দুর রহিম জুয়েল রেন্ট-এ কারের ড্রাইভার হিসেবে কাজ করতেন। তার গাড়ি ব্যবহার করে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সায়েম মির্জা সিলেটের মদন মোহন কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র।

শাহজালালের মাজারে হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, শাহজালালের মাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার জন্য নব্য জেএমবি যে সেলটি গঠন করেছিল, তার প্রধান নেতা ও সমন্বয়ক ছিলেন নাইমুজ্জামান। মাজারে হামলা করতে সিলেটের শাপলাবাগের একটি বাসাও তারা ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের আড়ালে সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ওই বাসা থেকে আইইডি ও কিছু বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এই সেলের কয়েকজন পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারেও চেষ্টা চলছে।

সিটিটিসি জানায়, গত ২৪ জুলাই রাত সাড়ে ৯টায় পুরানা পল্টন এলাকায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে আইইডিতে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক টেপ, জিআই পাইপের কনটেইনার, সার্কিটের অংশ, তারের অংশবিশেষ, লোহার তৈরি বিয়ারিং ও বল, নাইন ভোল্ট ব্যাটারির অংশবিশেষ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পল্টন মডেল থানায় একটি মামলা হয়। এই মামলার তদন্ত করতে গিয়েই জেএমবির পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জঙ্গিদের বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা নেই : জঙ্গিদের বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা নেই- জানিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা নেই নব্য জেএমবির। তাদের যে সক্ষমতা তা খুবই সামান্য। তাদের যে সক্ষমতা সেটি আমরা বিপর্যস্ত করেছি। তবু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এখনো উগ্রবাদে বিশ^াসী মানুষ দেশে আছে। তা ছাড়া আগস্ট মাস নানাভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলা এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটেছিল। তাই এই মাসে হামলার ঝুঁকি রয়েছে; কিন্তু এই গ্রেপ্তার অভিযানের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি অনেকাংশে প্রতিহত করতে পেরেছি। আর ২০০৪ ও ২০০৫ সালে দেশে জঙ্গিদের যে সক্ষমতা গড়ে উঠেছিল, সেটিই সর্বোচ্চ সক্ষমতা। এখন তাদের তেমন সক্ষমতা নেই। যদিও হলি আর্টিজানের ঘটনাটি নানাভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে ওই সময়ের সক্ষমতার তুলনায় এটি তেমন কিছুই না। হলি আর্টিজান হামলার বিশেষত্ব হচ্ছে- এখানে বিদেশিদের হত্যা করা হয়েছে। যারা হামলায় জড়িত ছিল তারা লেখাপড়া জানা ও অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারের সন্তান। তা ছাড়া টেকনোলজির যুগে এই হামলার প্রচার ও প্রপাগান্ডা বেশি হয়েছিল। জঙ্গিদের সক্ষমতা ২০০৫ সালের মতো গড়ে না উঠলেও যেটুকু গড়ে উঠেছিল, সেটি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তবে জঙ্গিবাদের বিস্তার হতে পারে- এমন অনেক কারণ সমাজে বিদ্যমান থাকায় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

জঙ্গিরা এখন তাদের প্রচার-প্রচারণায় সাইবার স্পেস ব্যবহার করছে- জানিয়ে সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিরা সাইবার স্পেসকে লাজেন্ট প্লাটফর্ম হিসেকে ব্যবহার করছে তারা। কোভিড আসার পর মানুষ ঘরে বেশি থেকেছে, ফলে জঙ্গিরা অনলাইনে প্রচার-প্রচারণা বেশি চালিয়েছে। অনেক বেশি মানুষ তাদের সাইটগুলোয় ভিজিট করেছে। এই সময়ে অনেককে আমরা গ্রেপ্তারও করেছি।

কোভিডের কারণে বিশে^ জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে- জাতিসংঘ মহাসচিবের এমন একটি ভবিষ্যৎদ্বাণী প্রসঙ্গে মনিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ভবিষ্যৎদ্বাণী কার্যকর হয়েছে বা হতে পারে বলে আমরা মনে করি না।

পুরনো জেএমবির বিষয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, পুরনো জেএমবির আমির সালউদ্দিন সালেহীন এখন ভারতে পলাতক। তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল অবস্থায় আছে বলেও তিনি জানান। জঙ্গিবাদের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা এবং ফিরে আসা ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ সম্পর্কে সিটিটিসির প্রধান বলেন, জঙ্গিদের ডি রেডিকালাইজেশন এবং পুনর্বাসনের উদোগ রাষ্ট্র নিয়েছে। যারা সাজা ভোগ শেষে বের হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই নজরদারিতে আছেন। তাদের অধিকাংশই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। সাজাভোগের পর কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলে তাকে সহযোগিতা করা হবে। এমনকি তাদের পুনর্বাসনের জন্য যদি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, সেটি যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই খাতে সরকারের বরাদ্দ রয়েছে।

Comment here