জোড়া খুনের আসামি আওয়ামী লীগ-বিএনপির মেয়র প্রার্থী! - দৈনিক মুক্ত আওয়াজ
My title
সারাদেশ

জোড়া খুনের আসামি আওয়ামী লীগ-বিএনপির মেয়র প্রার্থী!

প্রদীপ মোহন্ত,বগুড়া : বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহার পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রার্থীই জোড়া খুনের আসামি। এই দুই মেয়র প্রার্থীকে নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে আলোচনা-সামলোচনা।

জানা গেছে, সান্তাহার পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে মেয়র প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম মন্টুকে। বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বর্তমান তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টোকে। এই দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে রয়েছে জোড়া খুনের অভিযোগ। ইতিমধ্যে এই দুই প্রার্থীর নামে পুলিশ জোড়া খুনের মামলায় চার্জশিট দিয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমান বিএনপিদলীয় মেয়র তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টু জোড়া খুন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। আলোচিত সান্তাহার ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি শফিকুল ইসলাম ও অটোরিকশা শ্রমিক নেতা সোহরাব হোসেন সোহাগ হত্যা মামলার এ আসামি তৃতীয় বারের মতো নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

দল থেকে প্রার্থীতা দেওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে না পারলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতাকর্মী ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

দ্বিতীয় ধাপে ১৬ জানুয়ারি এ পৌরসভায় ইভিএম পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এর আগে তিনি প্রবাসী ছিলেন। দলে আসার পর ভুট্টু পৌর এলাকার বিএনপির ৫ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সদস্য হন। এরপর যুদ্ধাপরাধ ও মানবতা বিরোধী মামলার বর্তমান পলাতক আসামি বগুড়া-৩ আসনের বিএনপির সাবেক সাংসদ আব্দুল মোমিন তালুকদার খোকাকে ম্যানেজ করে গিত ২০১১ সালের পৌরসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো মনোনয়ন দৌঁড়ে সাবেক মেয়র ফিরোজ কামরুল হাসানকে পেছনে ফেলে প্রার্থীতা বাগিয়ে নেন ভুট্টু।

সেই নির্বাচনে ভুট্টু আওয়ামী লীগ প্রার্থী গোলাম মোরশেদকে পরাজিত করে মেয়র হন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তিনি পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের পদ পান। তবে ওই কমিটি পরবর্তী সময়ে বিলুপ্তি হওয়ায় এখন তিনি আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রয়েছেন।

দ্বিতীয় বার গত ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে ফের মনোনয়ন দেওয়া হয় ভুট্টুকে। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শ্রমিক লীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম রাজাকে পরাজিত করে বিএনপি প্রার্থী তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টু মেয়র হন। ২০১৬ সালের ৮ জানুয়ারি দুপুরে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম রাজার মেজো ভাই সান্তাহার ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি শফিকুল ইসলামকে।

হামলায় গুরুতর আহত অটোরিকশাচালক সোহরাব হোসেন দুদিন পর হাসপাতালে মারা যান। এ জোড়া খুনের মামলায় বিএনপি প্রার্থী ভুট্টুকে হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে আসামি করা হয়। পুলিশ তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে। এরমধ্যে ২০১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর সোহরাব হোসেন হত্যা মামলার চার্জশিট প্রদান করেন আদমদীঘি থানার এসআই শাহিন রেজা। এই মামলার বাদী হলেন নিহত সোহরাব হোসেনের বাবা আব্দুল খালেক শেখ। আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে ৬ নম্বর আসামি হলেন তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টু।

বিচারাধীন ওই মামলা থেকে বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন। এছাড়া অন্য মামলার বাদী হলেন নিহত শফিকুল ইসলামের বড় ভাই নুর ইসলাম। ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সান্তাহার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই সিদ্ধার্থ সাহা আদালতে চার্জশিট প্রদান করেন। এই মামলাতেও ৬ নম্বর আসামি হলেন তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টু।

সান্তাহার পৌর নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী (ধানের শীষ) বর্তমান মেয়র তোফাজ্জল হোসেন ভুট্টু জোড়া খুনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট হওয়ার কথা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র মূলকভাবে হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় তিনি জামিনে আছেন। আদালতের মাধ্যমেই তিনি সত্য প্রমাণ করবেন।

সান্তাহার পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক মেয়র ফিরোজ মো. কামরুল হাসান বলেন, ‘এবারও মনোনয়ন চেয়েছিলাম কিন্তু দল দেয়নি। যারা গতবার মেয়র ছিলেন বিএনপি এবার তাদেরই মনোনয়ন দিয়েছেন। ভুট্টু বিরুদ্ধে আদালতে মামলা থাকলেও দলের স্বার্থে তার জন্য কাজ করতে হচ্ছে।’

বগুড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ফজলুল বারী তালুকদার বেলাল বলেন, ‘জেলা এবং কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে মেয়র প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ভুট্টু বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে সেটি আদালতে বিচারাধীন। আদালত রায় দিলে পরবর্তীতে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফুল ইসলাম মন্টু দুটি হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। তাকেই এবার সান্তাহার পৌরসভার মেয়র পদে নৌকার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পদক আল রাজি জুয়েল সান্তাহার পৌরসভায় আশরাফুল ইসলাম মন্টুকে নৌকার মনোনয়ন দেয়ার তথ্যটি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘মন্টুর বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলার চার্জশিট হওয়ার বিষয়টি কেন্দ্র কমিটিকে জানানো হয়েছে। তারা যাচাই-বাছাই করার পর মনোনয়ন দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশরাফুল ইসলাম মন্টু ১৯৯৫ সালে যুবলীগের মাধ্যমে আওয়ামী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর ২০০২ সালে হন সান্তাহার পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। বিগত ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি সান্তাহার ইউপির চেয়ারম্যান হন। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়ন লড়াইয়ে শ্রমিকলীগ নেতা রাশেদুল ইসলাম রাজার সঙ্গে হেরে যান। সে ক্ষোভে তিনি গত পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী রাজার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। একই কারণে এরপর রাজার ছোট ভাই সান্তাহার ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি শফিকুল ইসলামকে প্রকাশ্যে হত্যা করার মাধ্যমে তিনি প্রতিশোধ নেন। এই হত্যা মামলার তিনি চার্জশিটভুক্ত আসামী। আদালতে মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় ২০১৬ সালেই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কার হবার পর থেকেই তাকে আর দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি।

হত্যা মামলার বাদী নিহত যুবলীগ নেতা শফিকুলের বড় ভাই নুর ইসলাম বলেন, ‘আদমদীঘি থানার পুলিশ কর্মকর্তা এসআই শাহিন রেজা বিগত ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট প্রদান করেন। আশরাফুল ইসলাম মন্টু এই অভিযোগপত্রে ১৩ নম্বর আসামি। আদালতে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু হত্যাকারীরা এখন আওয়ামী লীগের বড় নেতা। বীরদর্পে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব দেখে কষ্ট লাগছে।’

অন্য ঘটনাটিও ২০১৬সালের ১৪ জানুয়ারির। ব্যাটারিচালিত রিকশার চাঁদার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করা হয় শ্রমিক নেতা সোহরাব হোসেন সোহাগকে। এ ব্যাপারে পরবর্তী সময়ে থানায় মামলা করা হলে ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর আদালতে চার্জশিট প্রদান করা হয়। মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন সান্তাহার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই সিদ্ধার্থ সাহা। এই মামলাটিরও চার্জশিটভুক্ত ১৩ নম্বর আসামী হলেন মন্টু।

মামলার বাদী নিহত শ্রমিক নেতা সোহরাব হোসেন সোহাগের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক শেখ বলেন, ‘পুত্র হত্যা মামলাটি আদালতে বিচারাধীন।’ তিনি এই বিচার কার্যক্রমটি দ্রুত হোক সেই দাবি জানান।

সান্তাহার পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কাশেম জানান, তারা মোট পাঁচ প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে মন্টু নাম ছিল ৩ নম্বরে।

তিনি স্বীকার করেন যে, মন্টুর বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলায় চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। মামলাগুলো বিচারাধীন রয়েছে।

নৌকা প্রতীক পাওয়া প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম মন্টু দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগই বানোয়াট। যোগ্যতা দিয়েই তিনি দলে টিকে রয়েছেন এবং পৌর নির্বাচনে প্রতীক পেয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আদালতে চলামান মামলা দুটি প্রতিহিংসা বশত করা হয়েছে।

 

Comment here