সমস্যা বহুতল ভবন না কমপ্লায়েন্স - দৈনিক মুক্ত আওয়াজ
My title
সারাদেশ

সমস্যা বহুতল ভবন না কমপ্লায়েন্স

একটি শহর কতটা আধুনিক ও উন্নত, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় সে শহরে কি পরিমাণ বহুতল ভবন রয়েছে, তা দেখে। সর্বশেষ প্রযুক্তি সমৃদ্ধ বিশ্বসেরা দশটি অত্যাধুনিক শহরের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানটি জাপানের রাজধানী টোকিওর। এ শহরে গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য বহুতল ভবন।

সুউচ্চ এসব ভবন দেখে মনে হয় প্রতিযোগিতা চলছে, কে কাকে ছাড়িয়ে আগে আকাশ ছুঁতে পারে। এশিয়ারই এমন আরেকটি শহর সিঙ্গাপুর সিটি। বিশ্বজুড়ে এ শহরটির বিশেষ পরিচিতি রয়েছে বিস্তর আকাশচুম্বী অট্টালিকার জন্য। এসব ভবনের কারণেই সিঙ্গাপুর সিটির সমীহ জাগানো একটি ভাবমূর্তিও তৈরি হয়েছে। অত্যাধুনিক শহরের সেরা দশের তালিকায় যোগ্যতা দিয়েই স্থান করে নিয়েছে সিঙ্গাপুর।

এ তালিকায় থাকা আরেকটি নাম হংকং। এরও বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে সারি সারি গগণচুম্বী ভবনের জন্য। দুবাইও বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে এর বুকজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ ভবনগুলোর জন্য। একটি শহর, তথা একটি দেশ কতটা এগিয়ে যাচ্ছে, তা অনেকটাই অনুমান করা যায়, সে শহরের বুকে বহুতল ভবনের সংখ্যা বিচারেও। সম্প্রতি বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকা- ও প্রাণহানির ঘটনায় রাজধানীর বহুতল ভবনগুলো কতটা নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, যেখানে বহুতল ভবনের জন্য টোকিও, সিঙ্গাপুর, হংকং, দুবাই এসব শহর বিশ্ববাসীর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের সমীহ আদায় করে নিচ্ছে, পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা রুচির পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে অনন্য ভূমিকা রাখছে; সেই বহুতল ভবনের জন্যই ঢাকাকে এখন বলা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ নগরী। প্র

কৃতপক্ষে বহুতল ভবন কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হলো এসব ভবন নির্মাণে যথাযথ বিধি প্রতিপালনে বা কমপ্লায়েন্সে। টোকিও, সিঙ্গাপুর, হংকং ও দুবাইয়ে আকাশছোঁয়া যেসব ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স পুরোপুরি মানা হচ্ছে। আর ঢাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কমপ্লায়েন্স লঙ্ঘন করা হচ্ছে। কাজেই ঘটছে দুর্ঘটনা, হচ্ছে প্রাণহানি। নগর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যথাযথ বিধি মেনে নির্মাণ করা হলে দেশের বহুতল ভবনগুলো অনেক বেশি নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত থাকবে। এ ক্ষেত্রে ভবন মালিক ও মনিটরিং কর্তৃপক্ষ উভয়েরই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

রাজধানীতে যেসব বহুতল ভবন হচ্ছে, সেগুলোর নির্মাণকাজে যথার্থ মনিটরিং হয় না বলেই এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকাও জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে এসব সংস্থার মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বহুতল ভবনের গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বা বিএনবিসি যথাপালনে বিএনবিসি অথরিটি নামে একটি সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষও থাকা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন এলাকায় প্রায় ২২ লাখ ভবন আছে। এর মধ্যে বহুতল ভবনের সংখ্যা প্রায় ২৯শ। ইমারত বিধিমালার সব শর্ত মেনে একটি ভবন নির্মাণ করা হলে সেটিকে বলা হয় আদর্শ ভবন। একটি আদর্শ বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান যত শর্ত আছে, সেগুলো মানতে হবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে- ভবনে প্রবেশের প্রশস্ত রাস্তা থাকা; জমির ৫০ শতাংশ ছেড়ে ভবন নির্মাণ করা; ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের অনাপত্তিপত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে নির্মাণ করা এবং ওই পত্রে উল্লেখিত শর্তাদি পালন করা; পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের দেওয়া শর্তাদি মান্য করা; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির বেঁধে দেওয়া উচ্চতার মধ্যে ভবন নির্মাণ করা ইত্যাদি।

এ ছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ওয়াসাসহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার দেওয়া শর্তাদি মেনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা। তবেই তা হবে আদর্শ বহুতল ভবন। নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবীব এ প্রসঙ্গে বলেন, বহুতল ভবনকে নিরাপদ করতে হলে অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ করা যাবে না। রাজউক থেকে বহুতল ভবনে নির্মাণে যে স্ট্র্রাকচারাল ডিজাইনের অনুমোদন দেওয়া হবে, সেটি মেনে চলা এবং তা মানা হচ্ছে কিনা, রাজউকের তা তদারকি করতে হবে।

এ ছাড়া ভবনটিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ফায়ার ফাইটিং সিস্টেমসহ যেসব কমপ্লায়েন্স স্থাপন করার কথা, সেগুলো সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়েছে কিনা তাও মনিটরিং করতে হবে। এর পর বছর-বছর বিদ্যুৎ বিভাগ, গ্যাসসহ অন্যান্য সংস্থার দেওয়া সেবাগুলো ঠিক আছে কিনা, তাও নির্দিষ্ট সময় পর পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। এ ছাড়া তিন মাস পরপর আগুনের মহড়া, সতর্কীকরণ ও নির্গমন ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। এসব বিষয় নিশ্চিত হলে বহুতল ভবনগুলোর ব্যবহার নিরাপদ হবে। এগুলো করা হচ্ছে না বিধায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে হতাহতের সংখ্যা বেশি হচ্ছে।

বহুতল ভবনগুলো পরিণত হচ্ছে মৃত্যুকূপে। রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম নিরাপদ বহুতল ভবন প্রসঙ্গে বলেন, নির্মাণকাজ তদারকির জন্য রাজউকের তেমন জনবল নেই। যে স্থপতি ও প্রকৌশলী স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন তাদেরই নির্মাণকাজ তদারক করতে হবে এবং নির্মাণকাজ শেষে তাদের তত্ত্বাবধানে ভবন নির্মাণ হয়েছে মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। সেই প্রতিবেদনের আলোকে রাজউক অক্যুপেন্সি (ভবনে বসবাস বা ব্যবহার) সনদ দেবে। আর ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম স্থাপনের বিষয়টি তদারক করবেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। যদি বিএনবিসি অথরিটি নামে একটি কর্তৃপক্ষ থাকত, তা হলে সেই কর্তৃপক্ষ সার্বিক মনিটরিং করতে পারত।

বহুতল ভবনের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকার জন্য বিএনবিসি অথরিটি গঠন করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, আমাদের দেশে বহুতল ভবনের চাহিদা রয়েছে, প্রয়োজনও রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটাতে হলে অল্প জমিতে বেশি পরিমাণ ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র প্রয়োজন। এ জন্য বহুতল ভবনের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের উন্নত শহরগুলোর উদাহরণও টানেন। রাজউকের সাবেক এই প্রধান প্রকৌশলী জানান, ১৯৯৩ সালের বিএনবিসি এখন কার্যকর হবে না। এটি সংশোধন করে নতুন বিএনবিসি প্রণয়নের খসড়া ২০১৫ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছে। কিন্তু সেটি এখনো অনুমোদন পায়নি। গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম অবশ্য জানিয়েছেন, সরকার আগের বিএনবিসি সংশোধন করে নতুন বিএনবিসি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে।

Comment here